Saturday , September 19 2020
Home / গল্প / শিরশির হাওয়ায় চুলে বাঁধা স্কার্ফ থলথলে উড়ছে ।(তোরই_জন্য) | পর্ব ২
শিরশির হাওয়ায় চুলে বাঁধা স্কার্ফ থলথলে উড়ছে ।(তোরই_জন্য) পর্ব ২

শিরশির হাওয়ায় চুলে বাঁধা স্কার্ফ থলথলে উড়ছে ।(তোরই_জন্য) | পর্ব ২

পর্ব ২

আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“ডেঞ্জারাস না পাগল। আর এসব পাগলদের ট্রিটমেন্ট আয়ান ভালো করেই জানে। আয়ানের সামনে কেউ উঁচু গলায় কথা বলার সাহস পায় নি আর এ মেয়ে আমাকে সবার সামনে ইনসাল্ট করে গেল। ওর ইনসাল্ট যদি ওকে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।”

শিরশির হাওয়ায় চুলে বাঁধা স্কার্ফ থলথলে উড়ছে।

নুপুর নিজ হাতদুটো পিছনে আঁকড়ে ধরে তাকিয়ে আছে সে বিশাল সমুদ্র সৈকতের মাঝারে। আকাশ আর পানি কিভাবে মিশে আছে একসাথে যেন তাদের মাঝে কোনো দূরত্বই নেই। আকাশে মেঘগুলো নানান আকারে এঁকে যাচ্ছে। নীল ধূরসের মাঝে সাদা অভ্র, যেন রঙ তুলিতে আঁকা কারিগরি। এমন সময় কেউ তাকে মাথায় টোকা দিলো। ফিরে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো নুপুরের। এ’যে রূশ।

রূশকে দেখেই নুপুর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“এখানে কিভাবে? তুই না থাইল্যান্ডে ছিলি?”

“তোরা এখানে মজা করবি আর আমি ওখানে মাম্মা পাপার মাঝে পিশমু? তাই সুন্দর মতো মাম্মাকে পটায়া এসে পরসি। তোদের ছাড়া থাকতে এতো বোরিং লাগে লাইফটা।”

নুপুর রূশের পেটে আস্তে ঘুষি মেরে বললো,
“চান্দু বল জেলাস ফিল করতাসিলি আমরা আইসি তুই যদি মজা মিস করিস।”
“সেমই তো কইসি।”
“উঁহু সেম না।”

সামিরা টিটকারি মেরে বললো,

“তোরা দুইজনই ভুল কইসোস। এখানে মজনু এসেছে তায় লায়লার জন্য।”
নুপুর অবুঝের মতো প্রশ্ন করে বসলো,
“লায়লা মজনু না আগেই মইরা গেছে?”
“তুই গাঁধি তোর কথা বলছি। রূশ আসছে তোর জন্য। কি গো মজনু ঠিক না?”

রূশ একটু লজ্জা পেয়ে গেল। চুলে হাত দিয়ে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে হাত বুলালো। নুপুর সামিরার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙ্গালো। বললো,
“তো মজনু সাহেবের লায়লা তুমি খুঁজে দিবা? আমার ভাইয়ের জন্য অবশ্য বৌটা দরকার আছে। তাও অতি জলদি।”

রূশ চোখ তুলে তাকালো নুপুরের দিকে। নাক ফুলিয়ে বললো,

“কে তোর ভাই হে?”
“তুই আর কে?”
“কচু, এতো দূর থেকে আসছি। মোটেও মেজাজ খারাপ করবি না। তুই আমার বউ হবি। পড়াশোনাটা যাস্ট শেষ হইতে দেয় তোর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব। দেখি কে মানা করে।”
“আমি করমু।”
“কেন? কেন করবি?”
“তুই আমার ভাই লাগোস তাই।”
“দাঁড়া তুই….”

রূশ নুপুরকে ধরতে যেতেই নুপুর ছুটে পালালো। স্কার্টটা দুইহাতে ধরে পায়ের গোড়ালির উপরে নিয়ে সেই দৌড় দিলো। রূশ ছুটলো তার পিছনে। নুপুর মাঝে মাঝে পিছনে তাকাচ্ছিলো রূশকে দেখার জন্য। পিছন থেকে সামনে তাকানোর আগেই ধাক্কা খেল জোরে সোরে। তাল সামলাতে না পেরে ছেলেটিকে বুকে পরে গেল।

চোখ দুটো খুললো ধীরে ধীরে। কারো উপর পরেছে সে। সে সকালের ছেলেটি। ধারালো তীক্ষ্ণ চোখ দুটোর উপর প্রথমে চোখ পরলো। চোখদুটোর মণিতে সবুজ সবুজ আভা। সে চোখ থেকে চোখ সরিয়ে দেখলো চুলগুলো ভিজা। মুখে টপটপে পানি জমে আছে। যে শার্ট পরে আছে তার প্রথম দু’তিনটে বোতাম খোলা। উজ্জ্বল বর্ণে এ জলবিন্দু মুক্তোর ন্যায় স্থির হয়ে আছে আবার পরবর্তী মূহুর্তে গড়িয়ে পরছে। নুপুর কেমন যেন মগ্ন হয়ে দেখলো সে মুক্তোর মতো পানি ঝরতে। তার যেন খেয়ালই নেই। বাচ্চাদের মতো মুখে গলায় জমে থাকা পানির বিন্দু গুণছে। এ তার আরেক বদ অভ্যাস। কোনো কিছুতে মনোযোগ দিলে আশেপাশের কিছুই খেয়াল থাকে না। আর তার মনোযোগ দেওয়ার বস্তু সবগুলোর কোনোটাই কাজের হয় না।

সে অচেনা মানুষটি ভারী কন্ঠে বললো,

“এই যে ডিলা স্ক্র আমার শার্ট ছাড়বেন না শার্ট ছিঁড়ে ফেলার ইচ্ছা আছে?”

নুপুর অবাক হয়ে তাকালো। সে লোকটির শার্ট আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বোধহয় পরে যাওয়ার সময় ধরেছে। হরবরে সরে দাঁড়ালো। এ এক লজ্জাজনক অবস্থা।

কিন্তু সে মোটেও অপ্রস্তুত না হয়ে উল্টো ঝাড়ি মারলো,
“দেখে হাঁটতে পারেন না। আপনার জন্য আমি এখন পরেই যেতাম।”
“ওহ আমার দোষ? এ রসগোল্লার মতো বড় বড় দুইটা চোখ দিয়ে দেখতে পারেন না। দেখতে যেমন পেত্নীদের মতো মেজাজটাও তেমন খিটখিটে। মুখ খুললে যেন আগুন বের হয়।”
“আইসে, আপনার মুখ থেকে তো মিষ্টি পরে। কথা বলার আগে যেন জোয়ালা উতলে পরে।”
“তুমি নিজেই তো জোয়ালামুখি। নিজেকে একদিন আয়নায় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবা বুঝলা।”
“আমি প্রতিদিনই দেখি। আপনি নিজেকে দেইখেন দেখতে একদম রাণী কটকটি।”
“ওয়াট! ইউ আর ম্যান্টালি সিক। ডু ইউ নো দেট।”

রূশ এতোক্ষণ হা করে দুইজনের ঝগড়া দেখছে। কি হচ্ছে না হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। আশেপাশের মানুষরাও যেন মজা নিয়ে নিয়ে ঝগড়া উপভোগ করছে। সামিরা, নীলাদ্রি আর নিলয় দৌড়ে এলো। ভিড় জমেছে তার মানে নিশ্চয়ই নুপুর কোনো কান্ড করেছে। অপরদিকে রিহান আর বিজয় পানির মাঝে ছিলো। আয়ানও মাত্র পানি থেকে উঠে এসেছিলো। কিছু দূর থেকে চিল্লাচিল্লির শব্দে তারাও উঠে এগোচ্ছে। যেয়ে দেখে আবারও সেই মেয়ের সাথে ঝগড়াঝাটি চলছে। রিহান দৌড়ে গেল। আর বিজয় এক বিরক্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে রিহানের পিছনে গেল।

“তুই আমারে ম্যান্টালি সিক বলসোস। তুই সিক তোর পুরা ফ্রেন্ড গুষ্টি সিক। ডট ডট হুতুম পেঁচা কোহানকার।”
“এক্সকিউজ মি আপু ফ্রেন্ডগুষ্টি মানে?”
মোহন একটু পাশেই দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলো। নুপুরের কথা শুনে সে কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

নুপুর মোহনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় হাসিমুখে বললো,
“উনার বেয়াদবির চক্করে উনার পরিবারকে কিছু বলা ঠিক হবে না আর ফ্রেন্ড হয়ই তো বকা গালি ঝামেলা ভাগ করার জন্য তাই ফ্রেন্ডগুষ্টি।”
“ওহ নাইস কনসেপ্ট। প্লিজ কন্টিনিউ।”
“থ্যাঙ্কিউ ভাইয়া।”

মোহন তার দাঁত কেলিয়ে হেসে আবার খাওয়া শুরু করলো। নুপুর আবারও আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
“এবার বল কই ছিলাম আমি?”
“ফাইজলামিরও একটা লিমিট থাকে। আমি নাহলেও তোমার থেকে চার পাঁচ বছরের বড় আর আমার সাথে তুই তাকারি করছ?”
“তো তুই আমারে আজাইরা পেত্নী বলবি আর আমি তোরে হ্যাঁ স্যার, জ্বি জনাব, শুনছি সাহেব বলে সম্বোধন করব? আমার মুখে পাগল লেখা?”
এতোক্ষণ সব বন্ধুরা এসে পরেছে। রিহান এসে দেখে মোহন দাঁড়িয়ে খাচ্ছে আর তাদের ঝগড়ার মজা নিচ্ছে। সামিরা এসে দেখে তার ধারণা ঠিক। এ নুপুর ছাড়া আর কেউ নয়। সে নিজের কপালে এক বাড়ি মারলো।

আয়ান তার স্বর নিচু করে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“একটা সত্তি কথা বল তো তুমি ইচ্ছে করে আমার পিছনে লাগছ না? ছেলে দেখলে তর সয় না, না?”

নুপুর বমির আসার মতো ভাব করে বললো,
“ইসস আমার চয়েজ এতো জঘন্য মনে হয়? তোর মতো ছিলকুটের পিছে পরমু।”
“ওহ নিজেরে মিস ওয়ার্ল্ড মনে কর? দেখতে তো পেত্নীদের মতো।”
“ও তুই বুঝি নিজেকে আয়নায় দেখে আমার সাথে কম্পেয়ার করতাসোস।”
“ইউ….”

সামিরা নুপুরের সামনে এসে দাঁড়ালো। আয়ানের দিকে হাত জোর করে বললো,
“সরি সরি ভাইয়া। ও আসলে একটু রাগী টাইপের। রাগের মাথায় কি থেকে কি বলে ফেলে নিজেও জানে না। মাথার স্ক্রু তখন ঢিলা হয়ে যায়। মাফ করবেন।”

নুপুর চোখ দুটো ছোট করে বললো,
“কি ভুল বলসি আমি সব ঠিকই বলছি। এইটা তো…..”
সামিরা মুখ চেপে ধরলো নুপুরের। আয়ানের দিকে তাকিয়ে আবারও বললো,
“আমি ওর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি ভাইয়া।”

নুপুর তার মুখ থেকে সামিরার হাত সরিয়ে বললো,
“তুই ক্ষমা কেন চাবি? এই হুতুম হুতুম পেঁচার চোখ খুইলা লুডু খেলমু আমি। দাঁড়া শুধু।”

সামিরা আবারও নুপুরের মুখে হাত দিয়ে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এটারে জলদি নিয়া যা। লাগলে সমুদ্রে দুই মিনিটের জন্য চুবায় রাখ। কিছুক্ষণ তো মুখ বন্ধ থাকবে।”
নিলয় নুপুরের মুখে হাত দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল তাকে। নুপুর মুখে হাত রাখা সত্ত্বেও কিছু একটা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু কথাগুলো অস্পষ্ট।

রিহান চেঁচিয়ে বললো,
“উনাকে চিড়িয়াখানা খানায় রাখতে পারেন না। একদম পার্ফেক্ট জায়গা উনার থাকার জন্য।”
সামিরা পিছু ফিরে নুপুরকে নিয়ে যাওয়া দেখছিলো। রিহানের কথা শুনে তার দিকে তাকালো। দুইহাত দিয়ে কান ধরে বিনয়ী সুরে বললো,
“আমি ওর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। আসলে ও একটু পাগলাটে টাইপের। একদম বাচ্চাদের মতো স্বভাব। কিন্তু ওর মন একদম স্বর্ণের মতো খাঁটি। ওর কথা মনে নিবেন না প্লিজ।”

আয়ান উওরে বলল,
“আপনার কথা বার্তার ধরন ভালো লাগলো। ওই বাঁচালের মতো না। অসুবিধা নেই। মনে কিছু নিলাম না।”
সামিরা একরাশ হাসি ঠোঁটের কোণে এনে বললো,
“ধন্যবাদ ভাইয়া। আমি আসি।”

সামিরা যেতে নিলেই তার চুলের কাঁটা ব্যান্ট ভেঙে গেল। হাত চুলে দিতেই কাঁটা ব্যান্টের দু’টুকরো তার হাতে এসে পরলো। সাথে সাথে থলথল করে তার দীঘল কালো কেশ পিঠ ছড়িয়ে পরলো। ঢেউয়ের মতো বাঁকা চুল। সামিরা বিরক্তি নিয়ে একটু সামনে যেয়ে ক্লিপটা ফালালো। আর তার একরাশ চুল হাত দিয়ে সামনের একপাশে নিয়ে এলো। আর দেখতে দেখতে সে চলে গেল।

আয়ান বললো,
“এ মেয়েটা ভালো আছে। আগেরটার মতো না। ওই ফাজিল মেয়েটা।”

পাশে তাকাতেই দেখে রিহান তার পাশে নেই। ভ্রু নাচিয়ে বিজয়কে জিজ্ঞেস করলে বিজয় আঙুলের ইশারায় সামনে দেখালো। আয়ান দেখলো রিহান সে চুলের কাঁটাটি হাতে নিচে মুচকি হাসসে। উঠে আসলো আবার তাদের কাছে। আয়ান জিজ্ঞেস করলো,
“এভাবে হাসছিস কেন?”
“মেয়েটা কি কিউট দেখেছিস। ওর ফ্যাকাশে করা মুখখানি, ওর হাসি ওর থলথলে উড়ে যাওয়া চুলগুলো। সবকিছু কত সুন্দর।”
“তোর আবার কি হলো ভাই।”
“আই থিংক আই লাইক হার।”

চলবে…..

[দয়া করে ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *